মেটে আলু

বাঙাল মুলুকে গোল আলুর ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। ওলন্দাজরা এনেছিলো গোল আলু। এই তো সেদিন, বিজ্ঞানী জগদীশ বোস রবীন্দ্রনাথকে বললেন যে একটা নতুন তরকারি চাষ করেছেন, খেতে নাকি খুবই ভাল। তারপর রবীন্দ্রনাথও আলু করলেন (সূত্র- প্রথম আলো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)। তার আগ অব্দি আলু মানে মেটে আলু। মেটে আলু আমাদের খাঁটি দিশি আলু। এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে এর উদ্ভব। ক্রান্তীয় অঞ্চল মানে যে সব অঞ্চল দিয়ে কর্কটক্রান্তি (২৩.৫° উত্তর অক্ষরেখা) বা মকরক্রান্তি (২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষরেখা) চলে গেছে। আমাদের দেশের ঠিক বুকের উপর দিয়ে গেছে কর্কটক্রান্তি। সে হিসেবে… ধুত্তোরি ছাই! আসল কথা আগে বলে নিই। পেটভরে খেলে মাথা ঠিক থাকে না। ফালতু বকবকানিতে পেয়ে বসে।

* বড় করে দেখতে হলে ছবিতে টোকা দিন

আসল কথা হলো, মেটে আলু। মানে, মেটে আলুর ঝোল। মানে, ইলিশ মাছ দিয়ে মেটে আলুর ঝোল। (কেউ মনে করবেন না, আমি এখন ইলিশ মাছ কিনেছি। পয়লা অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা বন্ধ আছে। এ তার আগে কেনা ইলিশ। হুঁ হুঁ, আর যাই করি, মাছের বেলায় আমি আইন ভাঙি না।) আলুটা ছিল মাদাম তুসোর মূর্তির মোমের মত সাদা, মখমলের মত মোলায়েম। তার স্বাদ পুরোপুরি প্রকাশ করা মত ভাষা পৃথিবীতে জন্ম হয় নি। কবি হলে হয়তো তা কোনো এক প্রকারে বলে ফেলতে পারতাম (কবিরা এত কিছু নিয়ে লেখে, কিন্তু শাক-পাতা-আলু-কচু-মাছ নিয়ে কেন লেখে না, খোদা মালুম! এর চেয়ে বড়ো সরেশ বস্তু পৃথিবীতে আর কী আছে! হ্যাঁ, একজনই লিখেছিলেন। সুকুমার রায়। তাঁর খুরে খুরে প্রণাম। আহা! ‘খাই খাই করো কেন, এসো বোসো আহারে।’ কী উদার আহ্বান!)। কিন্তু, পেটে এটম বোমা ফাটালেও দু লাইন পদ্য বেরোবে না। অতএব, গদ্যেই যত বকবকানি। আবার কথায় কথায় বেপথু হচ্ছি। এই ইলিশ মাছ আর মেটে আলু আর একটু চইঝাল। রামপ্রসাদের সুরের মত সুরুয়া। মুখে দিলে মনের মধ্যে বেজে ওঠে, “মন তুমি কৃষিকাজ জানো না। এমন মানবজমিন রইলো পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোনা…”। আহা, ভিটেমাটি নেই, থাকলে কিছু না হোক মেটে আলু আবাদ করে মানবজীবন সার্থক করতাম। সোনা ফলিয়ে কী হবে! সোনা কী খাওয়া যায়? (যে সোনা খাওয়া যায়, সেই সোনার ধানের আবাদীরাও আজ ধনেপ্রাণে মরোমরো। সে গল্প আজ না, অন্যদিন।)

আমি বাংলাদেশের খোদ কৃষকের বংশধর। যে কৃষক বারংবার মন্বন্তরের কালে বনবাঁদাড় ঘেঁটে আলু-কচু-শুষনি শাক তুলে এনে খেয়েছে। তাই এইসকল লতা-গুল্ম-কন্দের প্রতি প্রীতি মনে হয় আমার জেনেটিক মেমোরিতে সঞ্চিত আছে। আমাদে বাড়িতে (মানে একদা যেখানে ভিটেমাটি ছিল) দেখেছি মেটে আলু করতে। একটা বড় গাছের পাশে গর্ত খুঁড়ে ছাই-মাটি দিয়ে ভর্তি করে মেটে আলু রুয়ে দেয়া হত। কতরকম বাহারি আলু। কোনটা ধপধপে সাদা, কোনোটা লালচে বেগুনি। কোনোটায় একটু গাল কুটকুট করে। একটা আলু ছিল, তার নাম ‘হরিণ শিঙে’ মনে হয়। তার কন্দ এদিক ওদিক ছড়িয়ে যায় বহুদুর পর্যন্ত। গোটা আলুটা খুঁড়ে তোলা খুবই মুশকিল হয়। আরেকটা আলুর নাম ‘আলতা পাতি’। এর খোসার নিচেটা আলতার মত লাল। আরেকটা আলুর নাম ‘বেনার ঝাড়’। আরো কত পদের আলু ছিল! নাম ভুলে গেছি। একবার ঠাকুর্দা একটা আলু তুলতে গিয়ে রীতিমত নাজেহাল হয়েছিলেন। গোটাটা খুঁড়ে বের করা যায় নি, এমনি বিচিত্র পথে মাটির নিচে তার বিস্তার ঘটেছিল। যতটুকু তোলা হয়েছিল, তার ওজন এক মণের বেশি। আলুর গাছে, মানে লতায় ছোটো ছোট আলু ধরে। আমরা বলতাম ‘আলুর বিচি’। এই বিচির তরকারি খাওয়া হতো না। এখন কেউ কেউ খায় শুনেছি। ‘আলুর বিচি’ শীতের ‘বিহানে’ আগুন পোহানোর সময় নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে খেতাম। আহা শৈশব!মেটে আলু

ইংরেজিতে এই আলুর সাধারন নাম Yam। বিজ্ঞানীরা ডাকেন Dioscorea alata নামে। দক্ষিণ এশিয়া এর জন্মভূমি। কিন্তু, তাইওয়ান, জাপান, চীন, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বহু জায়গায় এই আলু খুবই জনপ্রিয়। নানা দেশে কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রীম, কুকি ইত্যাদি বাহারি খাবার হয় এই আলু দিয়ে। ফিলিপাইনে একে বলে উবে (Ube)। বেগুনি উবে থেকে তারা বানায় উবে হালেইয়া নামে এক মিষ্টি। হালুয়ার মতই কতকটা। আর বানায় হালো-হালো (Halo-Halo) নামের এক পদের আইসক্রীম জাতীয় চিজ। গুর্জরদেশীয়দের ‘উন্ধিয়ু’র অত্যাবশ্যকীয় উপাদান এই মেটে আলু। আমাদের বাঁদাড়ের জংলা আলুর এত কদর কে জানতো!

* বড় করে দেখতে হলে ছবিতে টোকা দিন

তা, যে যাই বলুক, আমার এই ইলিশ মাঝের সুরুয়াই জবরদস্ত। আর সব তো খাই নি, না খেয়ে ভালমন্দ কেম্নে বলি? এই ঝাঁঝালো ঝোলের গন্ধে যে সুখ, আইসক্রীম-পেস্ট্রিতে কি আর তা পাওয়া যাবে!

নাহ্! খাওয়াটা একটু বেশি আঁটো হয়ে গেছে। ঠিকমত হজম হওয়ার জন্য পাতলা একটা ঝিম হওয়া দরকার। বাংলায় যাকে বলে ‘ভাতঘুম’।