মুজিকার আত্মকথন

হোসে আলবার্তো 'পেপে' মুজিকা কর্ডানো[হোসে মুজিকা। উরুগুয়ের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত। তাঁকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বিনম্র রাষ্ট্রপ্রধান। আবার একটা গোষ্ঠী তাঁকে বিশ্বের দরিদ্রতম রাষ্ট্রপ্রধানও বলে। ষাটের দশকে তিনি টুপামারো গেরিলা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। অনেক পরে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। মুজিকা প্রকৃতিঘনিষ্ঠ সরল জীবনযাপনের পক্ষে। সাম্য ও সমতা পক্ষে। এই লেখাটি মূলত ‘হিউম্যান দ্যা মুভি’ নামক একটা প্রামাণ্যচিত্রে মুজিকার কিছু বক্তব্যের অনুলিখন। তিনি খুব সহজ ভাষায় তাঁর জীবনদর্শনটি বলে গেছেন এখানে।]

আমি হোসে মুজিকা। জীবনের শুরুর দিনগুলোতে আমি মাঠে কাজ করেছি কৃষক হিসেবে, রুটিরুজির জন্য। তারপর আমি নিজেকে উৎসর্গ করেছি দিনবদলের সংগ্রামে, আমার সমাজের মানুষের জীবন উন্নত করার জন্য। আজ আমি রাষ্ট্রপতি। এবং আগামিকাল, আর সকলের মতই পোকার স্তুপে পরিণত হবো এবং অদৃশ্য হয়ে যাবো।

আমার জীবনে অনেক প্রতিবন্ধ ছিল, অনেক আঘাত; কিছু বছর কাটিয়েছি জেলে। সে যা হোক… যারা দুনিয়াটা বদলাতে চায়, এগুলো তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্রের অংশ। আশ্চর্য হলো, আমি এখনো টিকে আছি এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমি জীবন ভালবাসি। আমি চাই আমার জীবনের শেষ যাত্রাটি এমন হোক, যেন একটা লোক, যে কিনা কোনো পানশালায় গিয়ে সাকীকে (পানীয় পরিবেশক) বলছে, “এই দফা হোক আমার উদ্দেশ্যে।”

আমি এরকম বেয়াড়া, কারণ আমার মূল্যবোধ ও জীবনচর্চা সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিফলন যাদের সাথে থাকতে আমি সম্মান বোধ করি– এবং আমি তাদের সাথেই থাকি। রাষ্ট্রপতি হওয়াটা কোনো বড় কথা না। আমি এ নিয়ে অনেক ভেবেছি। জীবনে আমি প্রায় দশ বছর একলা কাটিয়েছি, একটা গর্তের মধ্যে। চিন্তা করার অনেকটা সময়.. সাতটা বছর কাটিয়েছি কোনো বইপত্র ছাড়া। ফলে, আমি চিন্তা করার সময় পেয়েছি। আমি ভেবে ভেবে যা বের করেছি তার সারকথা হলো- হয় তুমি সমস্ত অহেতুক বোঁচকা-গাট্টি থেকে মুক্ত হয়ে খুব অল্পে সন্তুষ্ট হবে, কারণ তোমার সুখ তোমার মাথার মধ্যে; নয়তো তুমি কোথাও সন্তুষ্টি পাবে না। আমি দারিদ্র্যের সাফাই গাইছি না, ভব্যতার পক্ষে বলছি। যবে থেকে আমরা একটি ভোগবাদী সমাজ উদ্ভাবন করেছি, তবে থেকে অর্থনীতিটা আকারে বাড়ছে। দুঃখের বিষয় হলো, এর গুণগত বৃদ্ধিটা হচ্ছে না। আমরা আজগুবি সব চাহিদার বিরাট এক পর্বত আবিষ্কার করেছি– দৈনিক নতুন নতুন জিনিস কেনো আর পুরোনোগুলো ফেলে দাও… এটা স্রেফ আমাদের জীবনের অপচয়! আমি যখন একটা কিছু কিনি বা তুমি যখন একটা কিছু কেনো, তখন কেবল টাকা দিয়েই তুমি তার দাম শোধ করো না, শোধ করো জীবন দিয়ে। কেননা, ওই টাকাটা তোমাকে জীবন ক্ষয় করেই আয় করতে হয়। একটা পার্থক্য বোঝা দরকার, জীবন হলো সেই জিনিস, যা টাকা হলেই কেনা যায় না। এটা কেবলই ছোট হতে থাকে। কারো জীবন ও স্বাধীনতা এইভাবে খরচা করে ফেলা খুবই দুঃখের ব্যাপার।

উরুগুয়ে একটা ছোট্ট দেশ। রাষ্ট্রপতির একটা আলাদা বিমান পর্যন্ত আমাদের নেই। আসলে, তাতে আমাদের থোড়াই কেয়ার। ফ্রান্স থেকে আমরা একটা খুবই দামি হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সার্জিকাল সুযোগসুবিধাসম্পন্ন একটা উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার; প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দেয়ার জন্য। রাষ্ট্রপতির বিমানের পরিবর্তে আমরা একটা উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার কিনতে চাই যেটাকে মধ্য-উরুগুয়েতে নিয়োগ করা হবে দুর্ঘটনায় পতিত মানুষদের উদ্ধার করার জন্য এবং জরুরী চিকিৎসাসেবা দেবার জন্য। এটা খুবই সোজা ব্যাপার। তোমার কি এ নিয়ে দ্বিধা আছে? রাষ্ট্রপতির বিমান বনাম উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। বিষয়গুলো এরকমই। আমার যেটা মনে হয়, ভব্যতার বিষয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি বলছি না যে আমাদের সেই গুহাবাসীদের যুগে ফেরত যেতে হবে বা খড়ের ঘরে বসবাস করা লাগবে, একদমই তা বলছি না। ভাবনাটা মোটেও সেরকম না। যেটা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের অবশ্যই অদরকারি জিনিসে, ধরো বিরাট এক বিলাসবহুল বাড়ি যা দেখাশোনা করতে ছয়জন চাকরবাকর লাগে, সে সবে সম্পদ অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কী হবে এসবে? কী হবে! এগুলোর কিছুই খুব দরকারি না। আমরা অনেক সহজভাবে বাঁচতে পারি। আমরা আমাদের সম্পদ সেই সবে ব্যবহার করতে পারি যা সবার দরকার। এটাই হলো গণতন্ত্রের আসল মানে, যে মানেটা রাজনীতিকরা হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ, রাজীনীতির মানে যদি হয় রাজমুকুট, সামন্তযুগের জমিদারের মত, কর্তা যখন শিকারে যাবেন, চারপাশে ভাঁড়ের দল তখন বাঁশি বাজাবে– ভাবনাটা যদি এমনই হয়, তাহলে এত বিদ্রোহ-বিপ্লবের কী দরকার ছিল? থাকতাম পড়ে আমরা সেই আগেকার যুগে! সমতার নাম করে তারপরে এইসব রাষ্ট্রপতির বিলাসবহুল প্রাসাদ ইত্যাদি, এগুলো ওই রাজা-জমিদারগিরিরই নতুন চেহারা। জার্মানিতে তারা আমাকে ২৫টা বিএমডব্লিউ মটরসাইকেল দিয়ে এসকর্ট করে এক মার্সিডিস বেঞ্জে চড়িয়ে নিয়ে চলল, বর্মের বহরে সে গাড়ির দরজার ওজন তিন টন– কী মানে আছে এসবের? (হা হা হা এটা একটা গল্প মাত্র)। আমি একটা নরমসরম মানুষ, যা সামনে আসে নিতে পারি, মানিয়ে নিতে পারি, কিন্তু তবুও… আমি যেরকম ভাবি, আমাকে সেটা বলতেই হবে।

আদত সমস্যাটা সম্পদের না, সমস্যাটা রাজনীতির। সরকারগুলো পরের নির্বাচনে জেতা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কে মাতব্বর হবে তাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমরা ক্ষমতার জন্য লড়াই করি… (নীরবতা) কিন্তু ভুলে যাই মানুষ আর পৃথিবীর সমস্যাগুলো। সমস্যাটা পরিবেশের না! সমস্যাটা রাজনীতির। আমরা সভ্যতার এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, এখন আমাদের একটা বিশ্বব্যাপী ঐক্য দরকার। আর আমরা সেটা থেকেই মুখ ফিরিয়ে আছি। আমাদের প্রদর্শনবাদ আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে, প্রতিপত্তির পিপাসা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে, বিশেষ করে শক্তিমান দেশগুলোকে। তাদের অবশ্যই একটা উদাহরণ তৈরি করতে হবে। এটা খুবই লজ্জার যে কিয়োটো প্রোটোকলের ২৫ বছর পরেও আমরা কেবল তার প্রাথমিক মাপকাঠি নিয়েই ব্যস্ত আছি। এটা খুবই লজ্জার!

মানুষ হয়তো একমাত্র প্রাণী যারা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম। এই উভয়সংকটই এখন আমাদের সামনে। আমার কেবল একটাই আশা, আমি যেন ভুল হই।

মানুষের চরিত্র এমনভাবে তৈরি যে মানুষ আরাম-আয়েশের জীবনের চেয়ে দুর্দশার জীবন থেকেই ভাল শিক্ষা নিতে পারে। এর মানে এই না যে আমি একটা দুঃখদুর্দশার জীবন সন্ধান করা পরামর্শ দিচ্ছি, বা সেরকম কোনোকিছু, কিন্তু আমি মানুষকে যেটা বোঝাতে চাই: তুমি সবসময় আবার উঠে দাঁড়াতে পার। জীবন যে কোনো সময় আবার শূন্য থেকে শুরু হতে পারে। একবার, কিম্বা হাজারবার, যতদিন তুমি বেঁচে থাকবে। সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। অন্যকথায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি হারতে পারো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তোমার লড়াই ছেড়ে দিচ্ছ। তুমি লড়াই ছাড়ছো মানে তুমি তোমার স্বপ্নও ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছ। লড়াই, স্বপ্ন, পড়ে যাওয়া, বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা– এটাই আমাদের অস্তিত্বকে, যে জীবন আমরা যাপন করি তাকে অর্থবহ করে তোলে। সারাক্ষণ অতীত ক্ষতের তোয়াজ করে জীবন চলতে পারে না। একই বৃত্তে ঘুরে ঘুরে জীবন চলতে পারে না। জীবনে যে দুঃখ পেয়েছি, তা কোনোদিনই সবটুকু উপশম হবে না। সেটা কেউ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। তোমাকে শিখতে হবে নিজের দুঃখ-ক্ষত পোঁটলা বেঁধে সামনে এগিয়ে যেতে হয় কীভাবে। আমি যদি সারাটা সময় নিজের ক্ষত নিয়ে আহা-উহুই করতে থাকি, তাহলে তো আমার আর এগোনো হবে না। আমি জীবনটাকে দেখি একটা রাস্তার মতন, যেমন করে সেটা সামনে পড়ে আছে, তেমনই। কেবল আগামিকালটাই আসল কথা। আমাকে সবাই বলে, সাবধান করে, একটা পুরোনো প্রবাদ ব’লে– ‘তুমি নিশ্চয়ই অতীতকে মনে রাখবে, নয়তো তুমি একই ভুল বারবার করবে।’ আরে ভাই, আমি মানুষকে জানি! মানুষ হলো সেই প্রাণী, যা একই পাথরে চৌদ্দবার ঠোক্কর খায়। প্রত্যেক প্রজন্ম তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, মোটেই তারা আগেকার প্রজন্মের অভিজ্ঞতার কাছে ফেরত যায় না। আমি মানবতাকে কোনো একটা আদর্শের ছাঁচে ফেলতে নারাজ। একজন আরেকজনের অভিজ্ঞতা থেকে কীইবা শিখতে পারে? আমরা প্রত্যেকে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই, আমরা তা থেকেই শিখি।

(হেসে) এই হলো জীবন নিয়ে আমার ভাবনা। আমি কোনোরকম কোনো প্রতিশোধ চাই না।

মুরহিলে ও চাঁদ মুলুকের ষাঁড়

একটি আফ্রিকান রূপকথার রূপান্তর

অনেক কাল আগে, আফ্রিকা দেশে মুরহিলে নামে এক ছেলে ছিল। মুরহিলের মা মনে করতো ছেলেটা একেবারে অকম্মার ঢেঁকি। সারাক্ষণ তাকে গালমন্দ করতেই থাকতো। সে যা করতো, কিছুই তার মায়ের মনে ধরত না, একটা কিছু খুঁত ধরাই চাই।

নিত্যি-নিত্যি এই অপমানে তিতিবিরক্ত হয়ে মুরহিলে তার বাপের একটা বসবার টুল চেয়ে নিল। এই টুলটা ছিল তাদের বংশের চৌদ্দ পুরুষের পুরোনো একটা জাদুর টুল। সেই টুলের উপরে বসে যতরকমের মন্তর-তন্তর তার জানা ছিল, সব আওড়াতে লাগলো। হঠাৎ টুলটা মাটি ছেড়ে উপরে উঠে গেল। আর সাঁ সাঁ করে ছুটে চললো চাঁদের দিকে।

চাঁদ মুলুকে নেমে মুরহিলে প্রথমেই লোকজনকে জিগ্যেস করলো, “তুমাগে সদ্দারের বাড়িডা কোনদিকি কও দিনি?” চাঁদ মুলুকের লোকজন বলল, “তা তোমারে বলবো কেন? আমাদের সর্দারের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে তোমার কী কাজ?” মুরহিলে বললো, “দাদা গো, দিদি গো, মাসি গো, মেসো গো, আমি বৈদেশী লোক। কিছুই তো চিনি না, তুমরা যা কবা আমি করে দেব। তুমরা খালি সদ্দারের বাড়ির ঠিকানাডা কও।” চাঁদ মুলুকের লোকেরা তখন তার কাছে পৃথিবীর খবরাখবর জানতে চাইলো। মুরহিলে যা জানে সব বললো। যা জানে না তাও সব বলে দিল বানিয়ে বানিয়ে। চাঁদ মুলুকের লোকেরা তার মুখে নিত্যনতুন আশ্চর্য সব খবর শুনে বেজায় খুশি হলো। বলে দিল সর্দারের বাড়ির হদিশ।

সর্দারের গাঁয়ে পৌঁছে তো মুরহিলে অবাক! এরা তো এখনো সেই আদিম যুগে পড়ে আছে! আগুন জ্বালাতে জানে না, মাংস খায় কাঁচা, বাসনপত্তর কিছুই নেই, রাতে ঠাণ্ডায় কাঁপে ঠক-ঠক করে!

মুরহিলে কাঠে কাঠ ঘষে আগুন জ্বালালো। তাজ্জব ব্যাপার! এমন কাণ্ড চাঁদ মুলুকের লোক কখনো দেখেনি। সর্দারের তো চক্ষু ছানাবড়া। এমন লোককে তো হাতছাড়া করা চলে না! মুরহিলে সর্দার আর চাঁদমুলুকের তাবৎ লোকের খুব প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলো। চাঁদ মুলুকের সর্বকালের সবচেয়ে বড় জাদুকর বলে লোকে তার জয়ধ্বনি করতে লাগলো।

তার এই আশ্চর্য কাজের জন্য চাঁদের দেশের মানুষেরা তাকে অনেককিছু উপহার দিল। উপহার বলতে, সে দেশের রেওয়াজ হলো গুণীজনদের অনেকগুলো গরু-বাছুর আর অনেকগুলো বৌ উপহার দেয়া। কিন্তু, মুরহিলে এমন কাজ করেছে, যা চাঁদের দেশের ইতিহাসে কেউ কখনো করেনি। তাই, সর্দারের একার পক্ষে তাকে উপযুক্ত উপহার দিয়ে পোষালো না। গ্রামের সব লোক, মানে মেয়ের বাপেরা এলো মুরহিলেকে তাদের জামাই করতে। অনেকগুলো বউ আর অনেকগুলো গরু-বাছুর পেয়ে সে রাতারাতি বিরাট বড়লোক হয়ে গেল!

চাঁদ মুলুকে বেশ কিছুদিন সুখে কাটিয়ে মুরহিলে এবার দেশে ফেরার আয়োজন করলো। মনে তার বিরাট গর্ব: এবার মা দেখবে, তার ছেলে কীরকম একটা কেউকেটা লোক হয়েছে!

সেজন্যে সে তার বন্ধু তোতাপাখিকে দেশে পাঠাল তার যাত্রার আগাম সুখবর প্রচার করার জন্য। এদিকে হয়েছে কী, মুরহিলে তো দেশে নেই অনেকদিন। তার পরিবার ভেবেছে অকম্মা ছেলেটা বুঝি মরে-হেজে গেছে চাঁদে গিয়ে। সে যে বেঁচে আছে তা তার পরিবারের কেউই বিশ্বাস করতে চায় না।

মুরহিলেকে গিয়ে তোতা যখন এই সংবাদ দিল, মরহিলে বললো, “তুই ব্যাটা বড় মিথ্যুক তোতা! তুই আসলে যাসইনি আমার বাপ-মায়ের কাছে। এদিক-ওদিক উড়ে ঘুরেফিরে এসে এখন ফালতো খবর দিচ্ছিস!” তোতা বলল, “বটে! আমি মিথ্যুক! দাঁড়া, দেখাচ্ছি তোকে!” বলেই তোতা আবার পাখা ঝাপটে চলে গেলে। পৃথিবী থেকে লাঠি হাতে মুরহিলের থুত্থুরে বুড়ো বাপকে ধরে আনলো। এবার বাপেরও বিশ্বাস হলো ছেলে বেঁচে আছে, আর ছেলেও বাপকে দেখে বেজায় খুশি। এবারে মুরহিলে নিশ্চিন্ত মনে পাঁজি দেখে পৃথিবীতে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করলো।

সে কী জমকালো আয়োজন! তার পাঁচ কুড়ি বউ আর সোয়া শ’খানেক ছেলেপুলেদের ভাল ভাল জামাকাপড় পরিয়ে হীরে-জহরত দিয়ে সাজালো। আরো সাথে যাবে হাজার হাজার গরু-বাছুর। বিরাট কাফেলা! মনে মনে ভাবলো, “এবারে মা নিশ্চয়ই তাজ্জব বনে যাবে!” কিন্তু, মুশকিল হলো, এত লোকজন আর এত এত গরুবাছুর তো জাদুর টুলে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না! কী করা যায়? শেষমেশ তারা পায়ে হেঁটেই পৃথিবীর পথে রওনা দিলো।

কিন্তু চাঁদ কি আর পৃথিবী থেকে এট্টুসখানি দূরে! সে যে অনেক দূর! মুরহিলে খানিক পথ গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো। তার পা আর চলে না।

তার সাথে আসা চাঁদ মুলুকের বেশ তাগড়া এক ষাঁড় তখন তাকে গিয়ে বললো, “বাপু, তুমি আমার আমার মনিব, তোমার এ কষ্ট তো আমার আর সহ্য হয় না। আমি জাদু জানি। সেই জাদুতে তোমাদের সক্কলকে দুনিয়াতে নিয়ে যেতে পারি। তবে হ্যাঁ, কথা দিতে হবে, আমাকে তুমি খাবে না।”

মুরহিলে তাকে কথা দিল, তাকে কখনো মেরে ফেলবে না, কখনো খাবে না। খুশি হয়েই কথা দিল। এমন জাদুর বলদ কার বাথানে আছে আর! ষাঁড় তখন আশ্চর্য জাদুবলে মুরহিলেকে দলবলসমেত পৃথিবীতে পৌঁছে দিল।

মুরহিলেকে ফিরে পেয়ে পরিবারের লোকেরা আনন্দে শিউরে উঠলো, তাদের চোখ ঠিকরে গেল মুরহিলে আর তার নতুন সংসারের জাঁকজমক দেখে।

এমনকি তার যে মা তাকে উঠতে-বসতে তুচ্ছজ্ঞান করতো, সেই মায়ের তো এখন আহ্লাদ আর অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। তার যেমন স্বভাব! সে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলের গুণকীর্তন শুরু করলো।

মুরহিলে তার বাপ-মা আর বাড়ির সকলকে ডেকে বলল, “দেখ, এই বলদের জন্য আমি আজ বাড়ি ফিরতে পেরেছি। খবরদার, একে কখনো মারবে না।” সবাই তাতে একবাক্যে রাজি।

দিন পেরিয়ে মাস গেল, মাস পেরিয়ে বছর গেল। ষাঁড়টাকে না মারার জন্য যে প্রতিজ্ঞা তারা করেছিল, তা সবাই গেল ভুলে। তাছাড়া, হাজার হাজার গরু-বাছুরের মধ্যে কোনটা কোন ষাঁড়, তা কী ছাই কারো মনে আছে নাকি!

একদিন তাই, মুরহিলের বাপ-মা সেই ষাঁড়টাকেই মেরে ফেললো খাওয়ার জন্য। মুরহিলের মা তেল-মসলা দিয়ে বেশ কষে রান্না করলো সেই ষাঁড়ের মাংস।

সেদিন সন্ধেবেলা, মুরহিলে বসেছে খেতে। মাংসের টুকরো তাকে দেখে কথা বলে উঠলো, “মুরহিলে! তুমি কথা রাখলে না! মেরে ফেললে আমাকে!” মুরহিলে পাত্তা দিল না। যেই না মুরহিলে মাংসের টুকরোটা মুখে পুরেছে, ওমনি স্বয়ং পৃথিবী তাকে কপ করে গিলে ফেললো, কবর দিয়ে দিলো মাটির তলার চির-অন্ধকারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পটির বাঙলা ভাষায় এই রূপান্তরিত সংস্করণের সর্বসত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছাপা বা অন্য মাধ্যমে এটি ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ রইলো।

ণত্ব ষত্ব বত্ব

অধুনা বাঙলা ভাষার বৈয়াকরণরা আমাদের সাংঘাতিক কয়েকটি ভুল তথ্য দিয়েছেন এতকাল। আমি ভাষা বিষয়ে বিষয়ীও না, অধিকারীও না। কিন্তু, ভাষাটা যেহেতু আমার, এবং যেহেতু আমি সেটা ব্যবহার করি, সেহেতু এর ব্যবহারিক অসঙ্গতি আমার চোখে বিলক্ষণ পড়ে। বাঙলাভাষী হিসেবে সে সব নিয়ে যদি কথা বলি, নিশ্চয়ই মহাজনদের আপত্তি করার কারণ নেই।

পয়লা, ন-এর কথায় আসি। বাঙলা ভাষায় তিনটি ন আছে। তালব্য ন বা ‘ঞ’, মূর্ধন্য ন বা ‘ণ’ ও দন্ত ন বা ‘ন’। হিসেবটা আসলে খুবই সোজা। তালব্য বর্ণের সাথে তালব্য ন , মূর্ধন্য বর্ণের সাথে মূর্ধন্য ন ও দন্ত্য বর্ণের সাথে দন্ত্য ন বসবে। একইভাবে, তিনটি স আছে, যাদের বলে শিস ধ্বনি। তারাও ওইরকম যথাক্রমে বসে। কেন বসে? কারণটা খুবই সোজা, ওইরকম বসা ছাড়া তাদের আর উপায় নেই। সে কথায় আসছি একটু পরে।

নতুন মহাজনেরা বলেন যে মূর্ধন্য ণ-এর ও মূর্ধন্য ষ-এর উচ্চারণ নাকি বাঙলা ভাষা থেকে লুপ্ত। এটি সর্বৈব ভুল। কথাটি চোখ বুজে এতকাল বিশ্বাস করেছি বলে ধরতে পারি নি। একদিন হঠাৎই পরিষ্কার হয়ে গেল। মূর্ধন্য ধ্বনি হলো সেইগুলো, যেগুলো মূর্ধা বা পশ্চাৎদন্তমূলে জিহ্বা উল্টে স্পর্শ করে উচ্চারণ করতে হয়। যথা- ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ষ প্রভৃতি। নিয়মটা হলো মূর্ধন্য বর্ণের সাথে সঙ্গত কারণেই মূর্ধন্য ণ বা ষ উচ্চারিত হবে। ফারাকটা এখনি আপনি টের পাবেন। উচ্চারণ করুন, দন্ত এবং দন্ড। দেখুন, দন্ত শব্দে ন উচ্চারণের সময় জিভ কোথায় থাকে আর দণ্ড শব্দে ণ উচ্চারণের সময় জিভ কোথায় থাকে। জিভ না উল্টিয়ে আপনি কোনোভাবেই দণ্ড বলতে পারবেন না, তা ‘দন্দ’ হয়ে যাবে। এবার দন্ত উচ্চারণ করতে গিয়ে দন্ পর্যন্ত বলে থামুন, ন-এর উচ্চারণ ধরে রাখুন। মগজে নোট নিন। আবার, দণ্ড উচ্চারণ করতে গিয়ে দণ্ পর্যন্ত বলে থামুন। মগজে নোট নিন। শ্রুতির পার্থক্যটাও ধরতে পারছেন কী? খুবই সহজ ব্যাপার। এবারে, একইভাবে অস্ত ও অষ্ট শব্দ দুটি উচ্চারণ করুন। ভাল করে খেয়াল করুন। উচ্চারণের স্থান আলাদা, ধ্বনির ফারাকটাও বুঝতে পারবেন। আপনি তবু যদি জোর করে অষ্ট শব্দটি অস্ট হিসেবে উচ্চারণ করতে যান, তবে ট আর ট থাকবে না, ট ও ত-এর মাঝামাঝি চলে যাবে।

আদিতে ণ-এর উচ্চারণ ছিল খানিকটা ড়ঁ-এর মত। যদি বিষ্ণু শব্দটি ষ-এর যথাযথ উচ্চারণ বজায় রেখে করতে যান, তবে ণ-এর শুদ্ধ রূপটি পাবেন। কিন্তু তেমন উচ্চারণ আমরা আজকাল করি না, তার দরকারও নেই। এখন আমরা বলি- বিশ্ঞু। ণ ও ষ এর উচ্চারণ তার আদি অবস্থা থেকে সরেছে বটে, কিন্তু একেবারে বিলুপ্ত মোটেও হয়নি। এমনকি, বিদেশি কোনো ভাষাতেও আপনি তালব্য বা দন্ত্য বর্ণের সাথে মূর্ধন্য ণ যুক্ত করে উচ্চারণ করতে পারবেন না। বিশ্বাস না হয় Fund শব্দটি উচ্চারণ করে দেখুন, জিভ ওল্টায় কিনা!

ৱ—ইহা একোনত্রিংশ ব্যঞ্জনবর্ণ এবং শেষ অন্তঃস্থ বর্ণ। [ ব-কার উচ্চারণ করিতে হইলে অধরোষ্ঠের আভ্যন্তর ও বাহ্য ভাগদ্বয় দ্বারা উত্তরদন্তাগ্র, অর্থাৎ ঊর্দ্ধ্বদন্তপঙ্‌ক্তির অগ্রভাগ স্পর্শ করিতে হয়, অতএব ব-কারের উচ্চারণে অধরোষ্ঠের আভ্যন্তর ও বাহ্য ভাগদ্বয় করণ এবং উত্তরদন্তাগ্র স্থান ( তৈ ২.৪৩ )। ‘ৱকারস্য দন্তোষ্ঠম্’ পা ১.১.৯, সি। দ্র ‘বর্গীয় ব১, য১। ]
—বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

আমার আরো একটি আপত্তি হলো অন্তস্থ ব বর্ণের বিলুপ্তি নিয়ে। এই বর্ণটি আমরা ছোটবেলায় আদর্শলিপিতে পড়েছি। য, র, ল এর পরে এটি থাকত। পরে বড় ক্লাসে উঠে জানলাম, এর উচ্চারণ বাঙলাভাষায় আর নেই। তাই এটিকে তুলে দেয়া হয়েছে বাঙলা বর্ণমালা থেকে। কিন্তু পরে আরেকটি বিষয় খেয়াল করে দেখতেই এ বর্ণটির অভাব অনুভব করলাম। ইংরেজি, ফারসি ইত্যাদি থেকে বাঙলায় যদি প্রতিবর্ণীকরণ করতে হয় তখন এ বর্ণটির দরকার আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। ইংরেজিতে W-এর প্রকৃত উচ্চারণ আসলে অন্তস্থ ব-এর মতই। উপরের সারির দাঁত ও নিচের ঠোঁট মিলিয়ে করতে হয়। যেমন, wall এর আসল উচ্চারণ হলো ৱোয়াল, ওয়াল নয়। তেমনি, ‘ৱকৎ’ও ওয়াক্ত নয়। এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

আসলে, বিদেশি অনেক ভাষাতেই ওষ্ঠ্য বর্ণগুলোর গুষ্টিসুদ্ধো একটা দন্তোষ্ঠ্য রূপ আছে। বাঙলাভাষা যে কেবল একটি সংজননশীল ভাষা, তা-ই তো নয়, এ ভাষা জাতপাতের বিচার করে দোস্তি করে না। যার কাছে যা পায়, বাবুই পাখির মত নিজের ঘরের মধ্যে এনে গোঁজে। এটা এর বিরাট শক্তিময়তা। আমরা অনেককিছু আমাদের করে নিতে গিয়ে বদলে নিয়েছি অনেককিছু। যে সব বদল হয়েছে মুখে মুখে। স্টেশন ইষ্টিশন হয়েছে, স্কুল ইশকুল হয়েছে। বড় মিষ্টি শোনায় শব্দগুলো। কিন্তু, কোনো শব্দ যদি চায় তার মূল রূপটি নিয়েই আমার ভাষার মধ্যে বসবাস করবে, তার সেই দাবিও সঙ্গত মনে করি। অন্তস্থ ব-এর কল্যাণে সেই দাবির খানিকটা পূরণ হওয়া খুবই সম্ভব ছিল। যে বর্ণটি আমি অন্তস্থ ব লিখতে ব্যবহার করেছি, সেটি ছাড়াও আজকের বর্গীয় ব-এর যে চিহ্ন, তাও অন্তস্থ ব লিখতেই ব্যবহার করা হতো। বর্গীয় ব লেখা হতো পেটকাটা ৰ দিয়ে। এখন পুনরায় বর্গীয় ব এর জন্য পেটকাটা ৰ এর প্রচলন খুবই ঝক্কির। তবে পণ্ডিত ও মহাজনেরা পরামর্শ করে অন্তস্থ ব এর চিহ্ন হিসেবে এটি ব্যবহারের বিধান দিতেই পারেন। কেননা, বর্ণটির যে ব্যবহারিক উপযোগ আছে, তা তো পষ্ট দেখাই যাচ্ছে। যদি উচ্চারণ বিলুপ্ত হওয়াই অন্তস্থ ৱ বর্ণটির বিলুপ্তির কারণ হয়, তবে সেই উচ্চারণের যুক্তিতেই তা আবার বাঙলা বর্ণমালায় ফেরত আসা উচিৎ।

মেটে আলু

বাঙাল মুলুকে গোল আলুর ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। ওলন্দাজরা এনেছিলো গোল আলু। এই তো সেদিন, বিজ্ঞানী জগদীশ বোস রবীন্দ্রনাথকে বললেন যে একটা নতুন তরকারি চাষ করেছেন, খেতে নাকি খুবই ভাল। তারপর রবীন্দ্রনাথও আলু করলেন (সূত্র- প্রথম আলো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)। তার আগ অব্দি আলু মানে মেটে আলু। মেটে আলু আমাদের খাঁটি দিশি আলু। এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে এর উদ্ভব। ক্রান্তীয় অঞ্চল মানে যে সব অঞ্চল দিয়ে কর্কটক্রান্তি (২৩.৫° উত্তর অক্ষরেখা) বা মকরক্রান্তি (২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষরেখা) চলে গেছে। আমাদের দেশের ঠিক বুকের উপর দিয়ে গেছে কর্কটক্রান্তি। সে হিসেবে… ধুত্তোরি ছাই! আসল কথা আগে বলে নিই। পেটভরে খেলে মাথা ঠিক থাকে না। ফালতু বকবকানিতে পেয়ে বসে।

* বড় করে দেখতে হলে ছবিতে টোকা দিন

আসল কথা হলো, মেটে আলু। মানে, মেটে আলুর ঝোল। মানে, ইলিশ মাছ দিয়ে মেটে আলুর ঝোল। (কেউ মনে করবেন না, আমি এখন ইলিশ মাছ কিনেছি। পয়লা অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা বন্ধ আছে। এ তার আগে কেনা ইলিশ। হুঁ হুঁ, আর যাই করি, মাছের বেলায় আমি আইন ভাঙি না।) আলুটা ছিল মাদাম তুসোর মূর্তির মোমের মত সাদা, মখমলের মত মোলায়েম। তার স্বাদ পুরোপুরি প্রকাশ করা মত ভাষা পৃথিবীতে জন্ম হয় নি। কবি হলে হয়তো তা কোনো এক প্রকারে বলে ফেলতে পারতাম (কবিরা এত কিছু নিয়ে লেখে, কিন্তু শাক-পাতা-আলু-কচু-মাছ নিয়ে কেন লেখে না, খোদা মালুম! এর চেয়ে বড়ো সরেশ বস্তু পৃথিবীতে আর কী আছে! হ্যাঁ, একজনই লিখেছিলেন। সুকুমার রায়। তাঁর খুরে খুরে প্রণাম। আহা! ‘খাই খাই করো কেন, এসো বোসো আহারে।’ কী উদার আহ্বান!)। কিন্তু, পেটে এটম বোমা ফাটালেও দু লাইন পদ্য বেরোবে না। অতএব, গদ্যেই যত বকবকানি। আবার কথায় কথায় বেপথু হচ্ছি। এই ইলিশ মাছ আর মেটে আলু আর একটু চইঝাল। রামপ্রসাদের সুরের মত সুরুয়া। মুখে দিলে মনের মধ্যে বেজে ওঠে, “মন তুমি কৃষিকাজ জানো না। এমন মানবজমিন রইলো পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোনা…”। আহা, ভিটেমাটি নেই, থাকলে কিছু না হোক মেটে আলু আবাদ করে মানবজীবন সার্থক করতাম। সোনা ফলিয়ে কী হবে! সোনা কী খাওয়া যায়? (যে সোনা খাওয়া যায়, সেই সোনার ধানের আবাদীরাও আজ ধনেপ্রাণে মরোমরো। সে গল্প আজ না, অন্যদিন।)

আমি বাংলাদেশের খোদ কৃষকের বংশধর। যে কৃষক বারংবার মন্বন্তরের কালে বনবাঁদাড় ঘেঁটে আলু-কচু-শুষনি শাক তুলে এনে খেয়েছে। তাই এইসকল লতা-গুল্ম-কন্দের প্রতি প্রীতি মনে হয় আমার জেনেটিক মেমোরিতে সঞ্চিত আছে। আমাদে বাড়িতে (মানে একদা যেখানে ভিটেমাটি ছিল) দেখেছি মেটে আলু করতে। একটা বড় গাছের পাশে গর্ত খুঁড়ে ছাই-মাটি দিয়ে ভর্তি করে মেটে আলু রুয়ে দেয়া হত। কতরকম বাহারি আলু। কোনটা ধপধপে সাদা, কোনোটা লালচে বেগুনি। কোনোটায় একটু গাল কুটকুট করে। একটা আলু ছিল, তার নাম ‘হরিণ শিঙে’ মনে হয়। তার কন্দ এদিক ওদিক ছড়িয়ে যায় বহুদুর পর্যন্ত। গোটা আলুটা খুঁড়ে তোলা খুবই মুশকিল হয়। আরেকটা আলুর নাম ‘আলতা পাতি’। এর খোসার নিচেটা আলতার মত লাল। আরেকটা আলুর নাম ‘বেনার ঝাড়’। আরো কত পদের আলু ছিল! নাম ভুলে গেছি। একবার ঠাকুর্দা একটা আলু তুলতে গিয়ে রীতিমত নাজেহাল হয়েছিলেন। গোটাটা খুঁড়ে বের করা যায় নি, এমনি বিচিত্র পথে মাটির নিচে তার বিস্তার ঘটেছিল। যতটুকু তোলা হয়েছিল, তার ওজন এক মণের বেশি। আলুর গাছে, মানে লতায় ছোটো ছোট আলু ধরে। আমরা বলতাম ‘আলুর বিচি’। এই বিচির তরকারি খাওয়া হতো না। এখন কেউ কেউ খায় শুনেছি। ‘আলুর বিচি’ শীতের ‘বিহানে’ আগুন পোহানোর সময় নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে খেতাম। আহা শৈশব!মেটে আলু

ইংরেজিতে এই আলুর সাধারন নাম Yam। বিজ্ঞানীরা ডাকেন Dioscorea alata নামে। দক্ষিণ এশিয়া এর জন্মভূমি। কিন্তু, তাইওয়ান, জাপান, চীন, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বহু জায়গায় এই আলু খুবই জনপ্রিয়। নানা দেশে কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রীম, কুকি ইত্যাদি বাহারি খাবার হয় এই আলু দিয়ে। ফিলিপাইনে একে বলে উবে (Ube)। বেগুনি উবে থেকে তারা বানায় উবে হালেইয়া নামে এক মিষ্টি। হালুয়ার মতই কতকটা। আর বানায় হালো-হালো (Halo-Halo) নামের এক পদের আইসক্রীম জাতীয় চিজ। গুর্জরদেশীয়দের ‘উন্ধিয়ু’র অত্যাবশ্যকীয় উপাদান এই মেটে আলু। আমাদের বাঁদাড়ের জংলা আলুর এত কদর কে জানতো!

* বড় করে দেখতে হলে ছবিতে টোকা দিন

তা, যে যাই বলুক, আমার এই ইলিশ মাঝের সুরুয়াই জবরদস্ত। আর সব তো খাই নি, না খেয়ে ভালমন্দ কেম্নে বলি? এই ঝাঁঝালো ঝোলের গন্ধে যে সুখ, আইসক্রীম-পেস্ট্রিতে কি আর তা পাওয়া যাবে!

নাহ্! খাওয়াটা একটু বেশি আঁটো হয়ে গেছে। ঠিকমত হজম হওয়ার জন্য পাতলা একটা ঝিম হওয়া দরকার। বাংলায় যাকে বলে ‘ভাতঘুম’।

আমরুলি শাক

জন্মের সময় বাপ-মা নাম রেখেছিল পঞ্চানন। শিবঠাকুরের নামে। আজ কেউ ডাকে পঁচা কেউ পাঁইচো কেউবা পেঁচা। এইই হয়। লোকে যা ডাকবে তাতেই নাম-পরিচয়। এ বেচারীরও একসময় সংস্কৃত ভাষায় নাম ছিল অম্ললোনী। এখন তার ডাকনাম আমরুল বা আমরুলি। বড়ো মনোহর দেখতে (এবং স্বাদে)। তার গুষ্টিগোত্রের তত্ত্বতালাশ পণ্ডিতরা করেছেন, আমি সেদিকে যাব না। আমার কেবল খাই-খাই স্বভাব, আমি অতএব সে পথেই যাব।

* বড় করে দেখতে হলে ছবিতে টোকা দিন



দিনকতক মুখে রুচি নেই। আমার রুচি বড় ঘন-ঘন বিগড়োয়। তাই নিত্যনতুন খাদ্যখাবারের তালাশ করতে হয়। অবশ্য, আমি সে তালাশ থোড়াই করি, আমার জননী পাখির মায়ের মত এটা-ওটা খুঁটে-বেছে এনে খাইয়ে-দাইয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আজ ভোরে দেখি কোত্থেকে এক মুঠো আমরুলি শাক তুলে এনেছেন। তাই দিয়ে শুকনো-শুকনো অম্বল রাঁধা হবে। শুকনো লঙ্কা পোড়া ডলে সেই অম্বল দিয়ে চারটি ভাত মেখে খেলে এক ঠ্যাং চিতেয় তোলা লোকেরও আরো দশটা বছর বাঁচতে ইচ্ছে করবে। তা, এ হেন আমরুলি শাকের জুড়িদার মাছ নেই ঘরে। ছোট চিংড়ি নিদেনপক্ষে লাগে। ভাল হয় গলদা চিংড়ির মাথার ঘিলু হলে। গায়ে জামাটা চড়িয়ে তড়িঘড়ি বেরুলাম। দেখি, যদি কপালে থাকে!

বাজারে গিয়ে বুঝলাম, পুলকের আতিশয্যে একটু বেশি সকাল-সকালই বাজারে চলে এসেছি। এখনো মেছোরা সব এসে পারে নি। বাজারে এক ছোট ভাই পরামর্শ দিলো, “মোস্তর মোড়ে চলে যান ভাই, ওখানে পাবেনই।” ছুটলাম মোস্তর মোড়ে। সেখানেও ঢু ঢু। বিফল মনোরথ হয়ে বয়রা বাজারে এসে আবার ঘোরাঘুরি করছি। যদি আসে, যদি আসে! মাছের ঝাঁকা নিয়ে কেউ ঢুকলেই ছুটে যাচ্ছি। কিন্তু বিধি বাম, ইঁচের মুড়োর কোনো পাত্তা নেই। শেষে মন্দের ভালো হিসেবে আধসের (সের তো না, কেজি) ছটফটানো নদীর চিংড়ি কিনে ফেললাম। আমাদের এই রূপসা-ভৈরবের চিংড়ি। বড়ই মিষ্টি। ঠিক সেই সময়!– এক ছোকরা ঢুকলো এক ঝাঁকা ইঁচের মুড়ো ওরফে চিংড়ি মাছের মাথা নিয়ে। রাগে আমার হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদার মতন অবস্থা। একটু ধাতস্থ হয়ে কিনে ফেললাম তাও আধসের।

তার পরের গল্প আর বলা ঠিক হবে না। শুধু এইটুকু বলি, দুনিয়াতে কিছু খাবার গাপুস-গুপুস খেয়ে শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে করে। আর কিছু খাবার আছে, তা অনন্তকাল বাংলায় যাকে বলে ‘আস্বাদন’ করতে ইচ্ছে করে। আমরুলি সেই জাতের চিজ।